মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ভাষা ও সংস্কৃতি

অতি প্রাচীনকাল হতেই জীবননগরঅঞ্চলবাঙালী সংস্কৃতির সকল ঐতিহ্য লালন পালন করে আসছে। দেশের লোকসাহিত্য ওলোকসংগীতে এ উপজেলার একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর নদীযা জেলার এই অংশটি পূর্ব পাকিস্থানের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভূক্ত হয়। বলা বাহুল্য, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি উন্নযনে কুষ্টিয়ার অবদান অনস্বীকার্য, অবিসংবাদিত। অসংখ্য ক্ষণজন্ম মানুষের দীপ্ত পদচারণায় উদ্ভাসিত এই পুণ্যভুমি। লালন শা, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ হোসেন, কাঙাল হরিণাথ, পাগলা কানাই, পাঞ্চুশা, ডঃ আবুল আহসান চৌধুরী প্রমুখ দিকপাল দেশ কালের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে আমত্মর্জাতিক পরিমন্ডলে স্থান লাভ করেছেন। কুষ্টিয়ার এই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল জীবননগরবাসীকে আন্দোলিত করেছে। পরবর্তীকালে জীবননগর চুয়াডাঙ্গার অমত্মর্ভূক্ত হলেও সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাটি বজাং রাখতে সক্ষম হযেছে।


            নিরীহ শহর জবিননগরের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস সুপ্রাচিন। ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে জানা যায় যে, শ্রীচৈতন্যদেবের অনেক অনুসারী প্রাচীন এই জনপদে বসবাস করতেন। চৈতন্যদেবের রাধাকৃষ্ণের ভাবলীলা আদি জীবননগরবাসীকে ভক্তিরসে সিক্ত করেছিল। যার ফলে চতুর্দশ শতকে এই জনপদে লীলাকীর্তন পরিবেশিত হত। লীলাকীর্তনের জন্য স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বহিরাগত অনেক নামিদামি কীর্তন গাইয়ে দৌলৎগঞ্জের সংস্কৃতিক পরিমন্ডলে অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। যারা লীলাকীর্তন পরিবেশন করতে পারেতন না, তারা ঢোল,এসরাজ এবং খোল বাজিয়ে সান্ধ্যকালীন সমযেনাম কীন পরিবেশনের মাধ্যমে ভক্তিরসে নিজেদের সিক্ত করে তুলতেন।

 

সাহিত্য সম্রাট বস্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় ঝিনাইদহ কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের সমযে অত্র অঞ্চলে কথা সাহিত্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাহিত্যেরএই রসধারা জীবননগরবাসীর সংস্কৃতি অঙ্গনকে অনেক সমৃদ্ধতর করেছিল। কথিত আছে কাশীপুর জমিদার বাড়িতে সে সময়ে সাহিত্য আসর বসত। শিল্পরসিক জমিদার বাবু অনেক নামিদামি সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ করে আনতেন রাজবাড়িতে। অমর কথা শিল্পী শরৎ চন্দ্র চট্রোপাধ্যায় একবার আমন্ত্রিত হয়েছিলেন কাশীপুরকে কেন্দ্র করে। এই তথ্যের যুক্তিযুক্ত কোন প্রমাণ না থাকলেও, ক্ষয়িষ্ণ জমিদারী প্রথার বিপর্যযের ফলে, তৎকালীন অভাব সম্বলিত সমাজের যে চিত্র ফুঁটে উঠেছে তা গল্পের পটভাবনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

 

পাকিস্থান এবং পাকিস্থান পরবর্তী সমযে সাহিত্য সংক্কৃতির চর্চা থেমে থাকে নি। এ সময়ে ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা চলত। বিশেষ করে ওস্তাদ আব্দুল লতিফ এবং আফসার আলী মিয়ার সঙ্গীত সাধনা জীবননগরবাসীকে মোহবিষ্ট করে রেখেছিল। অপরদিকে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে জীবননগর পাইলট হাইস্কুল এবং ঐতিহ্যবাহী শাহীন ক্লাব। জীবননগর আধুনিক শিল্প-সাংস্কৃতির বিকাশে প্রতিষ্ঠান দু’টির অবদান অপরিসীম্ মুন্সী আব্দুস ছাত্তার এর জ্ঞানসাধনা এবং সাহিত্র অনুরাগ স্কুলের মর্যাদাকে মহিমান্বিত করেছিল। বিশেষ করে তাঁর কবিতা ষাটের এবং সত্তরের দশকের দৈনিক নিয়মিতভাবে তাঁর কবিতা এবং পঠিতGreeting to the guestsকবিতাটি অস্ট্রেলিয়ার সাহিত্য আসরে স্থান লাভ করে এবং সে দেশের সাহিত্য পরিষদে সংরক্ষিত আছে।

 

শাহীন ক্লাব জীবননগরের সংগীত চর্চার পীঠস্থান। সাহাবুদ্দীন, মোমিন উদ্দীন এবং আববাস উদ্দীন ভ্রাতৃত্রয়ের ত্রিমূখী প্রতিভা জীবননগরের সঙ্গীত জগতকে ঈর্ষণীয় সাফল্যে ভরিয়ে তোলেন। সাহাবুদ্দনি নজরম্নল গীতিতে এলাকার জনপ্রিয় শিল্পী। আববাস উদ্দীন বর্তমানে জীবনমুখী সঙ্গীত পরিবেশন করে জেলার ভিতরে যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতে হাবিবুর রহমানের (সোনালী ব্যাংকে কর্মরত) সুরলিত কন্ঠ এলাকাবাসীকে মুগ্ধ করে।এ প্রসঙ্গে সঙ্গীতের সব্যসাচী প্রতিভা শওকত আলীর(মন্টু স্যার) কথা স্মরণ না করলে আলোচনা অসম্পুর্ণ থেকে যাবে। তাঁর কণ্ঠে ধনঞ্জয় ভট্রাচার্যের ‘ঝা না জা না বাঁজে’ গানটি আজও নষ্টালটিয়ার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে কাজী হাসানুজ্জামান (বাবলু মামা), মুন্সী আব্দুস সবুর, ওয়াহেদ মুরাদ আনন্দ, মোজাম্মেল হক, মোফাজ্জেল হোসেন (খোকন), আব্দুস সালাম (টি এন্ড টিতে কর্মরত) প্রমূখ জীবননগরের সঙ্গীত অঙ্গনকে সমৃদ্ধতর করেছেন।

জীবননগরের সাময়িক সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনায় উজ্জল আছে। এ প্রসঙ্গে কা গ ম হায়দা র ভাই এর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার উদ্যমী এবং সাহসী সম্পাদনার অবিস্মরণীয় দুষ্টামত্ম ‘জ্যোতি’ (১৯৮৪) এবং ‘সংলাপ’ (১৯৮১) এখনও আমাদের সাহিত্য জগতের পাথেয়। এছাড়া মীর মাহতাব আলীর সম্পাদনায় জীবননগর পাইলট হাইস্কুল থেকে ‘কাঁকলী’ (১৯৭৩) এবং শামসুল আসলাম তুহিনের সম্পাদনায় ‘রক্তরাগ’ (১৯৭২) সালে প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধের  প্রাবন্ধিক ও তার বন্ধু মোমিন উদ্দীনের সম্পাদনায় জীবননগর ডিগ্রী কলেজ থেকে ‘সূর্যসারথি’ উত্তম মিত্রের সম্পাদনায় ‘চোখ’ আক্তারুজ্জামান ছক্কু ও এম. আর. বাবুর সম্পাদনায় ‘মোহনা’ আলী মুনিরের সম্পাদনায় ‘সংশপ্তক’ সাময়িক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এই জনপদটির অতীত এবং বর্তমানের সাফল্যকে ধরে রাখার জন্য নানা পর্যায়ে উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে। কিছু কর্মযোগী মানুষ সর্বদা এলাকার মান উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ। এদের মধ্যে রুহুলআমিন মল্লিকস্মরণীয়। যিনি প্লাটফর্ম আটিস্ট ফোরাম প্রতিষ্ঠা করে গণমাধ্যম কর্মী ও বিতর্কীকদের মাঝে বিশুদ্ধ উচ্চারণের কর্মশালা পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

ছবি



Share with :

Facebook Twitter